Raisina Wire

ইউরোপ · মূল্যবৃদ্ধি-বিরোধী বিক্ষোভ

ইউরোপের রাস্তায় তরুণেরা: আবাসন ও খরচ নিয়ে বিক্ষোভ ছড়াচ্ছে, দেশজোড়া ধর্মঘটের পথে ফ্রান্স

ফ্রান্সে মিছিলে ৪.১ লক্ষ মানুষ, মিলানে সেনা নামাল ইটালি, লিসবনে আবাসন আন্দোলনের শিবির ভাঙল পুলিশ। ভাড়া ও জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে ক্ষোভ ছড়াচ্ছে।

ভাড়া, বেতন আর জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে গোটা ইউরোপে। রয়টার্স ও এপি-র সূত্রে দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, ফ্রান্সের ইউনিয়নগুলি দেশজোড়া ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে, ইটালি মিলানের রাস্তায় সেনা নামিয়েছে, আর পর্তুগালের পুলিশ লিসবন ও পোর্তোয় আবাসন আন্দোলনের শিবির ভেঙে দিয়েছে।

ফ্রান্সে গত মাসে স্কুলের দুরবস্থা নিয়ে যে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা এখন সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে বড় বিদ্রোহের চেহারা নিয়েছে। বাড়ির খরচ সামলানোই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় সাধারণ ইস্যু, বিশেষ করে তরুণদের কাছে।

ফ্রান্স: ৫ নভেম্বর ধর্মঘটের ডাক

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, শনিবার ২৪ অক্টোবর মিছিলে যোগ দেন ৪.১ লক্ষ মানুষ। ৭০,০০০ পুলিশকর্মী মোতায়েন থাকায় ১৭ অক্টোবরের মতো লুটপাট ও ভাঙচুরের পুনরাবৃত্তি হয়নি। গ্রেফতারের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১,৩১৪, যা আগের সপ্তাহের অর্ধেক, আর আহত হয়েছেন প্রায় ৫০ জন পুলিশকর্মী, যেখানে আগের সপ্তাহে সংখ্যাটা ছিল ১,০০০-এর বেশি।

এই শান্তি বেশি দিন টিকবে না বলেই মনে হচ্ছে। শ্রমিক নেতারা শনিবার ৩১ অক্টোবর আরও বিক্ষোভ এবং ৫ নভেম্বর দেশজোড়া ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। বামপন্থী সলিদের ইউনিয়ন মহাসঙ্ঘের সহ-নেত্রী মিউরিয়েল গিলবের বলেন, "আমরা ক্ষোভের জমাট বাঁধা দেখছি।" তাঁর কথায়, ছাত্র, শ্রমিক আর দমকলকর্মীরা এক জায়গায় আসছেন। ২০১৮ সালে জ্বালানি করের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনও সমাবেশের ডাক দিয়েছে, যার মধ্যে আছে টাউন হল ও ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির বাইরে অবস্থান।

পুলিশ ইউনিয়নগুলি সতর্ক করেছে, এত বড় মোতায়েন দীর্ঘ দিন টানার মতো লোকবল তাদের নেই। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাকরঁর হাতে ছাড় দেওয়ার সুযোগ কম। ২০১৯ সালে তিনি ইয়েলো ভেস্টদের জন্য জ্বালানির দাম কমানোর টাকা জোগাড় করতে পেরেছিলেন; এখন সরকারি কোষাগার চাপে, তাঁর মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী এপ্রিলে, আর তাঁর দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। ইউনিয়ন ও ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে, তবে আন্দোলনের নেতারা প্রস্তাবগুলিকে যথেষ্ট নয় বলছেন।

ইটালি: সেনা আর বোর্ডে ঢাকা দোকান

শনিবার মিলান, রোম ও তুরিনে হাজার হাজার তরুণ মিছিল করেন। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি মিলানে আরও ৫০০ সেনা পাঠিয়েছেন, যা সেখানে আগে থেকে মোতায়েন কয়েকশো সেনা এবং প্রায় ৫,০০০ পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীর অতিরিক্ত। তিনি নাবালকদের জন্য কড়া শাস্তিরও ঘোষণা করেছেন, পুলিশের দাবি আগের সপ্তাহের হিংসাত্মক ভিড়ের বড় অংশই ছিল তারা।

মিলানে শান্তি বজায় ছিল, যদিও গুচি, টিফানি ও ওমেগা-সহ বিলাসবহুল দোকানগুলি জানলা বোর্ডে ঢেকে দেয়। রোম ও তুরিনে অল্প সময়ের জন্য সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীরা জাতীয় শক্তি নিয়ন্ত্রকের দফতরের বাইরে গোবর ফেলে এবং বিদ্যুতের একটি বিশাল নকল বিল পোড়ায়।

পর্তুগাল: আবাসন আন্দোলনের শিবির ভাঙা হল

লিসবনে আবাসন সঙ্কটের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মিছিলের পরে রবিবার ভোর ২টোর কিছু পরে পুলিশ রোসিও স্কোয়ারে ১০০-র বেশি তাঁবুর শিবিরে অভিযান চালায়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের উপর লাঠি চালায় এবং ২৫ জনকে গ্রেফতার করে। পোর্তোয় প্রায় ৫০টি তাঁবুর একটি ছোট শিবিরও ভেঙে দেওয়া হয়, সেখানে গ্রেফতার হন ছ’জন। পুলিশ অভিযানকে "সামঞ্জস্যপূর্ণ" বলেছে এবং সাত জনের সামান্য চোটের কথা জানিয়েছে; আন্দোলনকারী গোষ্ঠী কাসা পারা ভিভের-এর দাবি, আহত ৬০ জন।

অভিযোগটা গুরুতর। পর্তুগালে ২০১৭ সালের পর থেকে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, নতুন ভাড়া চুক্তিতে ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ। ব্যাঙ্ক অব পর্তুগালের হিসেবে দেশে ৩ লক্ষ বাড়ির ঘাটতি, যা লিসবনের মোট বাড়ির সমান। বিক্ষোভকারীদের দাবি, সরকার উচ্ছেদ সহজ করার বিল প্রত্যাহার করুক এবং নতুন ভাড়া চুক্তিতে ভাড়ার ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দিক।

বেলজিয়ামের পুলিশ ব্রাসেলসে সরকার-বিরোধী বিক্ষোভকারীদের উপর কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে, আর আবাসনের অভাব ও চড়া ভাড়া নিয়ে স্পেনে সাম্প্রতিক বিক্ষোভও একই চাপের ছবি দেখায়।

Raisina Wire বিশ্লেষণ

ইউরোপের বিক্ষোভ একটা আন্দোলন নয়, একটা মেজাজ: এমন এক প্রজন্ম যারা বাড়ি কিনতে পারে না, আর এমন সব সরকার যাদের হাতে শান্তি কেনার টাকা আর নেই। ফ্রান্সেই এই টানাপড়েন সবচেয়ে স্পষ্ট। পুলিশ একটা শনিবার সামলাতে পারে, কিন্তু বেতন, ভাড়া আর সরকারি পরিষেবার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, আর পুলিশ নিজেই বলছে এই প্রয়াস দীর্ঘ দিন চালানো যাবে না।

ভারতের কাছে তাৎক্ষণিক ঝুঁকিটা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক। ধর্মঘটের দিকে এগোনো ফ্রান্স, যেখানে মাকরঁর মেয়াদ এপ্রিলে শেষ, আর বাণিজ্যিক রাজধানীকে দুর্গ বানানো ইটালি, এমন সহযোগী যাদের হাতে বাণিজ্য ও কৌশলগত উদ্যোগের জন্য সময় কম থাকবে। গভীর শিক্ষাটা আরও দূরে পৌঁছয়। বাড়ি যখন তরুণদের নাগালের বাইরে চলে যায়, রাস্তায় ক্ষোভ নামে, আর তা কোনও সরকারের সাড়া দেওয়ার আগেই এক দেশ থেকে আর এক দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।