Raisina Wire

ইরান · সভ্যতা ও ক্ষমতা

পারস্য থেকে ইরান: বিজেতাদের আত্মস্থ করা এক সভ্যতা কেন আজও বিশ্বকে অস্বস্তিতে রাখে

২৪০টি রাজ্য আর 'রাজাধিরাজ' থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র: ইরানের দীর্ঘ যাত্রাই ব্যাখ্যা করে তার আজকের জেদ, আর ভারতের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক।

ইরানকে প্রায়ই বিশ শতকের এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়, যাকে গড়েছে তেল, বিপ্লব আর পশ্চিমের সঙ্গে সংঘাত। এই দৃষ্টিভঙ্গি গল্পের বেশির ভাগটাই বাদ দিয়ে দেয়। ইরান বিশ্বের প্রাচীনতম জীবন্ত সভ্যতাগুলির একটি, আর তার রাজনৈতিক প্রবৃত্তি তৈরি হয়েছিল ইউরোপ, ইসলাম বা অতলান্তিক ব্যবস্থার উত্থানের অনেক আগে। তেহরান কেন এমন আচরণ করে, আর কেন সে বারবার প্রভাবশালী শক্তিগুলিকে অস্বস্তিতে ফেলেছে, তা বুঝতে হলে অনেক পিছন থেকে শুরু করতে হবে, যেমনটা লেখক নবরূপ সিংহ ও হিমজা পারেখ তাঁদের সাম্প্রতিক এক প্রবন্ধে যুক্তি দিয়েছেন।

২৪০টি রাজ্যের এক জগৎ

পারস্য নামটি এসেছে 'পার্স' থেকে, যা আজকের ফার্স প্রদেশ। কিন্তু পারস্য কখনওই গোটা ইরান ছিল না। মধ্য পারসিক ঐতিহ্যে ইরানি মালভূমি ও তার আশপাশে ২৪০টি পর্যন্ত রাজ্যের কথা আছে, যারা স্বশাসিত হলেও কোনও একক শাসকের বদলে ভাষা, আচার আর এক অভিন্ন বিশ্ববীক্ষায় বাঁধা ছিল।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জগতে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র সরেছে: পূর্বে বলখ থেকে মিডিয়া, তার পরে পার্থিয়া, শেষে পার্স। কোনও রাজ্য বাকিদের ছাপিয়ে উঠলে সে তাদের বিলুপ্ত করেনি, তাদের উপর শাসন করেছে। এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে ইরানের সবচেয়ে টেকসই রাজনৈতিক ধারণা: শাহানশাহ, অর্থাৎ রাজাধিরাজ। এর মানে একক নিরঙ্কুশ ভূখণ্ডের অধিকার নয়, শাসকদের এক স্তরবিন্যাস, যেখানে অধীন রাজারা যত দিন সম্রাটের সর্বোচ্চতা মানতেন, তত দিন নিজেদের জমিতে শাসন চালাতেন।

ভারতীয় পাঠক এই যুক্তি চিনতে পারবেন। ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তার রাজাধিরাজ আর চক্রবর্তীর মধ্যে এই ধারণার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। লেখকদের কথায়, ইরানি কল্পনায় সাম্রাজ্য ছিল "পার্থক্যের বিনাশ নয়, বহুত্বের সমন্বয়"।

সাম্রাজ্য, আর যে বিজেতাদের সে আত্মস্থ করেছিল

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে দ্বিতীয় সাইরাস পারসিক নেতৃত্বে ইরানি জগৎকে একত্র করে তখনকার বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্য গড়েন। এর শিকড় ছিল আরও পূর্বে, আবেস্তায় বর্ণিত আদি ভূমি ঐর্যান বৈজায়, যে শব্দ বদলাতে বদলাতে এরান এবং শেষে ইরান হয়েছে।

গ্রিকদের কাছে পারস্য যুদ্ধে হেরেছে, কিন্তু ইতিহাসে নিজের ভূমিকা হারায়নি। আলেকজান্ডার তাকে জয় করে তার দরবারি রীতি আর শাসনপদ্ধতিই গ্রহণ করেছিলেন। পরে পার্থীয় ও সাসানীয় সাম্রাজ্যই ছিল রোমের একমাত্র প্রকৃত সমকক্ষ; ইউফ্রেটিস ছিল সমানে-সমানে এক সীমান্ত।

সবচেয়ে গভীর ভাঙন এল সপ্তম শতকে, যখন বাইজ়েন্টিয়ামের সঙ্গে যুদ্ধে ক্লান্ত সাসানীয় সাম্রাজ্য আরব মুসলিম বাহিনীর সামনে ভেঙে পড়ল। ভাষা, ধর্ম আর শাসকশ্রেণি, সবই বদলে গেল। ইরানি ইতিহাসবিদ আবদোলহোসেন জাররিনকুব তার পরের পর্বকে বলেছিলেন "নীরবতার দুই শতাব্দী"।

তবু এই সভ্যতা টিকে গিয়েছিল বিজেতাদেরই বদলে দিয়ে। পারসিক প্রশাসকেরা আব্বাসীয় খিলাফত চালাতেন, পারসিক পণ্ডিতেরা গ্রিক বিজ্ঞান রক্ষা ও প্রসার করেছিলেন, আর পারসিক কবিরা ইসলামকে দিয়েছিলেন নতুন গভীরতা। তুর্কি সেলজুকরা শাসন করেছিলেন পারসিক রাজার মতো; মোঙ্গল খানেরা প্রশাসন চালাতেন ইরানি আধিকারিকদের দিয়ে। শব্দও স্মৃতি ধরে রেখেছে: আরবিতে 'প' ধ্বনি নেই, তাই পার্স হল ফার্স আর পারসিক ভাষা হল ফারসি, কিন্তু ভারতে পালিয়ে আসা জরথুস্ট্রীয়রা পুরনো নামটাই রেখে দিয়েছিলেন। আজও তাঁরা পার্সি।

সাফাভিদ সংশ্লেষ

সাফাভিদ রাজবংশ দ্বাদশ ইমামি শিয়া ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে এই পুনরুদ্ধার সম্পূর্ণ করে। তা হয়ে উঠল বিশ্বাসও, আবার সুন্নি অটোমান ও মধ্য এশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে এক ভূরাজনৈতিক প্রাচীরও। বিশ্বাস আর সার্বভৌমত্বের মেলবন্ধন, ধর্মীয় কর্তৃত্ব আর ঘেরাওয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, যা আজকের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পরিচয়, তার উৎস এই সংশ্লেষ।

পুরো সময় জুড়ে ইরান ছিল ইউরেশিয়ার চৌমাথায়, ভূমধ্যসাগর, মধ্য এশিয়া, ভারত আর চিনকে জুড়ে, রেশম, মশলা আর বস্ত্রের ব্যবসা করে, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র আর রাষ্ট্রকৌশল পৌঁছে দিয়ে।

আধুনিক সংঘাত

উনিশ শতকে ব্রিটেন ও রাশিয়া আনুষ্ঠানিক উপনিবেশ না গড়েই ইরানের সার্বভৌমত্ব ফাঁপা করে দিয়েছিল। ১৯৩৫ সালে রেজ়া শাহ বিদেশি সরকারগুলিকে দেশটিকে ইরান বলতে অনুরোধ করেন, যা ছিল পুরনো গ্রিক ও লাতিন রীতির সংশোধন, নতুন উদ্ভাবন নয়। ১৯৫৩ সালে মহম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে ইঙ্গ-মার্কিন অভ্যুত্থান ইরানিদের এই সন্দেহকে পোক্ত করে যে, তাদের স্বাধীনতা তত দিনই সহ্য করা হবে, যত দিন তা বাধ্য থাকবে।

১৯৭৯ সালের বিপ্লব শুরু হয়েছিল স্বৈরতন্ত্র আর বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক বিদ্রোহ হিসেবে, পরে তা গুটিয়ে গেল এক দমনমূলক ব্যবস্থায়। এল বিপ্লবী আদালত, শুদ্ধিকরণ, আর ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের উত্থান। প্রবন্ধ অনুযায়ী, আজ আসল ক্ষমতা ক্রমশ রেভলিউশনারি গার্ডের হাতে, যাদের প্রভাব অর্থনীতির সর্বত্র। বাইরে, নিজের সীমান্ত থেকে সংঘাত দূরে রাখতে ইরান ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে মিত্রদের এক জাল গড়েছে, আর ইজ়রায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে সংঘাত উপসাগরকে বারুদের স্তূপ করে তুলেছে।

ভারতের কেন মাথা ঘামানো উচিত

ভারতের কাছে ইরান দূরের কোনও গল্প নয়। সংস্কৃত আর আবেস্তা ভাষাগত দিক থেকে আত্মীয়; ফারসি ভারতের রাষ্ট্রকৌশল, সাহিত্য আর স্থাপত্যকে গড়েছে; আর পার্সিরা আজও ভারতীয় জীবনে প্রাক-ইসলামি ইরানকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। লেখকদের কথায়, এই সম্পর্ক জোটের রাজনীতির উপর নয়, সভ্যতাগত স্বীকৃতির উপর দাঁড়িয়ে।

Raisina Wire বিশ্লেষণ

প্রবন্ধের মূল দাবি, ইতিহাসে ইরানের উপর চাপ দুটোর একটা ফল দিয়েছে: দীর্ঘ নীরবতা, নয়তো গভীর নবজাগরণ। রাষ্ট্র ভাঙলেও সভ্যতা টিকে থাকলে ইরান আবার ভিতরে গুটিয়ে অপেক্ষা করতে পারে, যেমন আগেও করেছে। আর যদি সে টিকে যায় ও নিজেকে মানিয়ে নেয়, তবে কৌশলগত স্বাধীনতা চাওয়া, নিজের পরিচয়ে সচেতন এক সভ্যতাগত রাষ্ট্র হিসেবে সে আরও কঠোর হতে পারে।

যা-ই হোক, নয়াদিল্লির উচিত তেহরানকে ওয়াশিংটনের চেয়ে লম্বা ঘড়িতে মাপা। যে সভ্যতা গ্রিক, আরব, তুর্কি আর মোঙ্গলদের আত্মস্থ করেছে, সে নিজের সিদ্ধান্ত নির্বাচনী চক্রে মাপে না। উপসাগরে শক্তি, যোগাযোগ আর প্রবাসী ভারতীয়দের স্বার্থ জড়িয়ে থাকা ভারতের কাছে এই ধৈর্য একই সঙ্গে সতর্কবার্তা ও সুযোগ।