Raisina Wire

ইজরায়েল নির্বাচন

ইজরায়েলের আরও ডানদিকে যাত্রা: শুধু সরকার বদল, নাকি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্রেরও পরিবর্তন?

নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু আরও বড় প্রশ্ন—তিনি সরে গেলেও কি বদলাবে ইজরায়েলের কৌশলগত অবস্থান?

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ইজরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে পারে। কিন্তু এই নির্বাচনের আসল তাৎপর্য শুধুমাত্র বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতায় ফিরবেন কি না, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হল, দীর্ঘ সংঘাত, নিরাপত্তার ব্যর্থতা এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক মেরুকরণে বদলে যাওয়া ইজরায়েল কি নিজের পথ পরিবর্তন করতে পারবে? নাকি নেতৃত্বে পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান একই থাকবে?

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর এটিই ইজরায়েলের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। তার পর গাজায় বিধ্বংসী যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক মহলে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান ও বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা—সব মিলিয়ে এই নির্বাচন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। Al Jazeera+1

এই ভোটের প্রভাব নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চেয়ে অনেক বড়। নেতানিয়াহুর পরীক্ষা: ক্ষমতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব ইজরায়েলের দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ডানপন্থী, অতি-ডানপন্থী এবং অতি-অর্থডক্স দলগুলির সমর্থনে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

তাঁর বিরোধীদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা, বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের প্রচেষ্টা এবং দীর্ঘ সামরিক সংঘাতের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি। এর পাশাপাশি রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে চলতে থাকা দুর্নীতির বিচার।

কিন্তু নির্বাচনে নেতানিয়াহুর পরাজয় মানেই ইজরায়েলের নীতিতে আমূল পরিবর্তন—এমন নিশ্চয়তা নেই। বিরোধী শিবিরের মধ্যেও নিরাপত্তা, প্যালেস্তাইন এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে বিকল্প সরকার গঠন করাই হতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ। Al Jazeera+1

একজন নেতাকে সরানো আর সেই নেতাকে ক্ষমতায় রেখেছে যে রাজনৈতিক মানসিকতা, তাকে বদলানো—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ডানদিকে ঝোঁক কোনও এক নেতার রাজনৈতিক প্রকল্প নয় ইজরায়েলের ডানপন্থী প্রবণতা এই নির্বাচন দিয়ে শুরু হয়নি। আবার তা শুধুমাত্র নেতানিয়াহুর লিকুদ দলের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলিতে তরুণ ইহুদি ইজরায়েলিদের মধ্যে ডানপন্থী ও মধ্য-ডানপন্থী রাজনৈতিক পরিচয়ের শক্তিশালী উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ, এই প্রবণতা এমন এক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ, যা একটি সরকার বদলালেই অদৃশ্য হয়ে যাবে না। Al Jazeera+1

৭ অক্টোবরের হামলার অভিঘাত, নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস এবং প্যালেস্তাইন প্রশ্নে আপসের বিরোধিতা—এই সবকিছু মিলে ইজরায়েলের রাজনৈতিক পরিসরকে প্রভাবিত করছে।

ফলে নতুন প্রধানমন্ত্রী এলেও গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর কিংবা আঞ্চলিক প্রতিরোধমূলক সামরিক কৌশল নিয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান কতটা বদলাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। গাজা: পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা প্যালেস্তিনীয়দের কাছে এই নির্বাচন কোনও নিশ্চিত আশার বার্তা নিয়ে আসছে না।

গাজার মানুষ এখনও বাস্তুচ্যুতি, চলাচলের বিধিনিষেধ, পুনর্গঠন এবং স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। অন্যদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং ভূখণ্ডের অধিকার নিয়ে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। Al Jazeera+1

প্রশ্নটা তাই শুধু কে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা নয়। নতুন সরকার কি এমন কোনও বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে এগোবে, যেখানে প্যালেস্তিনীয়দের অধিকার, নিরাপত্তা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নের বাস্তব সমাধান খোঁজা হবে?

সেই পরিবর্তন না এলে সরকার বদল হবে, কিন্তু সংঘাতের মূল কাঠামো অক্ষত থেকে যেতে পারে। সংখ্যার রাজনীতি: জয়ী হয়েও কি সরকার গঠন সম্ভব? ইজরায়েলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের নির্বাচনী ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য ১২০ আসনের নেসেটে অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন।

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত পূর্বাভাসে নেতানিয়াহুর জোট কিংবা প্রধান বিরোধী জোট—কেউই নিশ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠতার অবস্থানে ছিল না। ফলে ছোট দল এবং আরব-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থান সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে বড় রাজনৈতিক শিবিরগুলির সঙ্গে তাদের জোট গঠনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বাধা রয়েছে। Al Jazeera+1

এখানেই তৈরি হচ্ছে এক রাজনৈতিক বৈপরীত্য। ভোটাররা ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে রায় দিলেও বিকল্প সরকার গঠনের মতো স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও দিতে পারেন।

ফলে দীর্ঘ জোট-আলোচনা, অস্থির সরকার কিংবা নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা তখন নীতিগত পরিবর্তনের বদলে বর্তমান পরিস্থিতিকেই দীর্ঘায়িত করতে পারে। কেন এই নির্বাচন ভারতের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ? ইজরায়েলের নির্বাচনের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানায় আটকে থাকবে না।

আমেরিকার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং প্যালেস্তাইন প্রশ্নে কূটনীতির ভবিষ্যৎ। আরব দেশগুলির কাছে তা প্রভাব ফেলবে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনার ওপর। ইউরোপের কাছে আন্তর্জাতিক আইন, বসতি নীতি এবং জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের জন্যও বিষয়টি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইজরায়েল ভারতের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। একই সঙ্গে উপসাগরীয় স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্যপথ এবং আরব দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কও ভারতের বৃহত্তর স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।

অর্থাৎ, ইজরায়েলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকারের ওপরও পড়তে পারে—প্রধানমন্ত্রীর পদে যে-ই থাকুন না কেন। ভোটের বাইরেও রয়েছে আসল রায় এই নির্বাচন ঠিক করতে পারে ইজরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন। কিন্তু এটি একা মেটাতে পারবে না নিরাপত্তা ব্যর্থতার জবাবদিহি, প্যালেস্তাইনের ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং দীর্ঘ সংঘাতের কৌশলগত মূল্য নিয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলি।

নেতানিয়াহু জোটের সমীকরণে ক্ষমতায় ফিরতে পারেন। তিনি ক্ষমতা হারালেও ডানপন্থী রাজনৈতিক প্রবণতা অটুট থাকতে পারে। আবার কোনও পক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে দেশটি নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখেও পড়তে পারে।

প্রশ্ন তাই শুধু নেতানিয়াহু জিতবেন না হারবেন, তা নয়। প্রশ্ন হল—ইজরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি সেই কৌশলগত পথের বিকল্প তৈরি করতে পারবে, যে পথ দেশটিকে আজকের পরিস্থিতিতে নিয়ে এসেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর না মিললে, ক্ষমতার শীর্ষে পরিবর্তনের চেয়ে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্রে ক্রমবর্ধমান কঠোরতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।