ইরান · যুদ্ধের ব্যাখ্যা
ইরান যুদ্ধের ব্যাখ্যা: আট মাসে নিহত সর্বোচ্চ নেতা, অবরুদ্ধ হরমুজ, বদলে যাওয়া পশ্চিম এশিয়া
২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা থেকে হরমুজ প্রণালীর লড়াই: যুদ্ধ কী ভাবে ছড়াল, কী দাম দিতে হল, আর কেন প্রতিটি ট্যাঙ্কারের দিকে নজর রাখছে ভারত।
আমেরিকা ও ইজ়রায়েল ইরানে হামলা চালানোর আট মাস পরে এই যুদ্ধ এক সর্বোচ্চ নেতার প্রাণ নিয়েছে, গোটা পশ্চিম এশিয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে ঘরছাড়া করেছে, আর বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল যে পথে যায় সেই হরমুজ প্রণালীকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক জলপথ করে তুলেছে। নতুন দফার লড়াই ঠেকাতে আঞ্চলিক দূতেরা যখন তেহরানে বৈঠকে বসেছেন, তখন দেখে নেওয়া যাক সংঘাত কী ভাবে এগোল, আর ভারতের কাছে কেন তা এত গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধের পথ
সংঘাত তৈরি হচ্ছিল বহু বছর ধরে। ২০১৮ সালে আমেরিকা ২০১৫-র পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়, আর ২০২৫ ও ২০২৬ সালে নতুন চুক্তির চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২০২৫-এর জুনে ইজ়রায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ হয়, যা থামে ফোর্দো, নাতান্জ় ও ইসফাহানের পরমাণু কেন্দ্রে আমেরিকার বাঙ্কার-বাস্টার বোমা হামলার পরে।
ইরান তাতে দুর্বল হয়ে পড়ে। তার মুদ্রার দাম হু হু করে পড়ে, আর অর্থনীতি নিয়ে ২০২৫-এর ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিক্ষোভ জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ৮ জানুয়ারি নিরাপত্তাবাহিনী গুলি চালায়; ইরানের নিজের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের আধিকারিকদের হিসেবে মৃতের সংখ্যা ৩০,০০০ বা তার বেশি। পরের কয়েক সপ্তাহে আমেরিকা ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পরে এই অঞ্চলে তার বৃহত্তম সামরিক সমাবেশ ঘটায়।
প্রথম আঘাত
২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজ়রায়েল শুরু করে ওয়াশিংটনের ভাষায় অপারেশন এপিক ফিউরি: প্রথম ১২ ঘণ্টায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা, সামরিক পরিকাঠামো ও নেতৃত্বের উপর প্রায় ৯০০টি হামলা। প্রথম দফাতেই নিহত হন সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই, সঙ্গে কয়েক ডজন শীর্ষ আধিকারিক। একটি হামলা লাগে বন্দর আব্বাসের কাছে মেয়েদের একটি স্কুলে, প্রাণ যায় প্রায় ১৭০ জনের।
শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং আরও কঠোর হয়েছে। প্রথম কয়েক দিন দেশ চালান নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি। খামেনেইয়ের ছেলে মোজতবা, যিনি বাবার চেয়েও কট্টর বলে পরিচিত, মার্চের গোড়ায় সর্বোচ্চ নেতা হন। ১৭ মার্চ লারিজানি নিহত হওয়ার পরে তাঁর উত্তরসূরির নিয়োগে স্পষ্ট হয়ে যায় যে যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্তে এখন ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের আধিপত্য।
আঞ্চলিক যুদ্ধ
ইরান জবাব দেয় শয়ে শয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আর হাজার হাজার ড্রোনে, শুধু ইজ়রায়েলে নয়, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরিন, ইরাক, ওমান ও জর্ডনে আমেরিকার ঘাঁটি ও দূতাবাসেও। কৌশল ছিল যুদ্ধকে এতটা ছড়িয়ে দেওয়া যাতে তার দাম অসহনীয় হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় দিনেই ড্রোন আঘাত হানে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, গোটা অঞ্চলে বিমান চলাচল থমকে যায়, আর মার্চের শেষে ইয়েমেনের হুথিরা আরও একটি ফ্রন্ট খুলে দেয়।
২ মার্চ হিজ়বুল্লা লেবানন থেকে ইজ়রায়েলে হামলা চালায়। ইজ়রায়েল বেরুট পর্যন্ত হামলা ও দক্ষিণে স্থল অভিযানে জবাব দেয়; মার্চের শেষে লেবাননে ১১ লক্ষের বেশি মানুষ ঘরছাড়া হন।
হরমুজের লড়াই
আসল রণাঙ্গন ছিল সমুদ্র। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক চলাচল ৯০ শতাংশের বেশি কমে যায়। যুদ্ধের আগে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলার থেকে তেলের দাম মার্চে গড়ে ১০৩ ডলারে পৌঁছয়, আর এশিয়ার কিছু অংশে জ্বালানির ঘাটতি ও রেশনিং শুরু হয়। ইরান কিছু জাহাজকে নিজের ঠিক করা পথে, মোটা মাসুল নিয়ে যেতে দেয়, আর মে মাসে প্রণালী চালানোর জন্য একটি কর্তৃপক্ষ গড়ে।
৭ এপ্রিল, নিজের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা ঘনিয়ে আসতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পোস্ট করেন, "আজ রাতে একটা গোটা সভ্যতা মরে যাবে, আর কখনও ফিরবে না।" কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দু’সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হন। ইসলামাবাদে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফের আলোচনা, যা ১৯৭৯-র পরে সর্বোচ্চ স্তরের সরাসরি যোগাযোগ, ব্যর্থ হয়, আর ১৩ এপ্রিল আমেরিকার নৌবাহিনী ইরানের বন্দর অবরোধ শুরু করে।
১৪ জুন পাকিস্তান একটি সমঝোতাপত্রের কথা ঘোষণা করে, যাতে ১৭ জুন সই হয় এবং যার লক্ষ্য ছিল ৬০ দিনে যুদ্ধ শেষ করা: লেবাননে লড়াই বন্ধ, হরমুজ দিয়ে অবাধ চলাচল, নিষেধাজ্ঞায় ছাড়, আর ইরানের পুনরায় অঙ্গীকার যে সে পরমাণু অস্ত্র বানাবে না। প্রণালীর প্রশ্নেই তা আটকে যায়। ৬ ও ৭ জুলাই আমেরিকার সুপারিশ করা পথ দিয়ে যাওয়া তিনটি জাহাজে হামলা চালায় ইরান; ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি শেষ বলে ঘোষণা করেন। পরের সপ্তাহে আমেরিকার বাহিনী প্রায় ১৪০টি লক্ষ্যে ৩০০-র বেশি হামলা চালায়, জর্ডনে দুই মার্কিন সেনা নিহত হন, আর ইরান তার প্রতিশ্রুতি স্থগিত করে।
এখন পরিস্থিতি
অগস্টের বেশির ভাগ সময় লড়াই থেমে ছিল। আমেরিকার সেনার দাবি, তারা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের পথ থেকে ইরানের মাইন সরিয়ে দিয়েছে এবং ওমানের উপকূল বরাবর একটি করিডর খুলেছে, আর অক্টোবরের মাঝামাঝি উপসাগরীয় তেল রফতানি যুদ্ধের আগের স্তরে ফিরেছে, যদিও এখন আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি তেল যায় পাইপলাইনে। তবে ট্যাঙ্কারে হামলা এখনও চলছে, আর ইজ়রায়েল ও আমেরিকায় নির্বাচন কয়েক দিন দূরে থাকায় দুই সরকারই ফের হামলার হুমকি দিচ্ছে।
সরকারি হিসেবে, লেবাননে ৪,০০০-এর বেশি, ইরানে প্রায় ৩,৫০০, ইজ়রায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলিতে কয়েক ডজন মানুষ এবং ২১ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। স্বাধীন হিসেবে সংখ্যাটা আরও বেশি।
Raisina Wire বিশ্লেষণ
ভারতের কাছে এই যুদ্ধ শক্তি নিরাপত্তার এক কঠিন পরীক্ষা। ভারতীয় শোধনাগারগুলি উপসাগর থেকে যে অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ কেনে, হরমুজ তার প্রধান ধমনী, আর বসন্তের দামের ধাক্কা ও এশিয়ায় জ্বালানির ঘাটতি দেখিয়েছে, একটা অবরোধ কত তাড়াতাড়ি ভারতের পেট্রল পাম্পে পৌঁছয়। উপসাগরীয় রফতানির আংশিক পুনরুদ্ধারের বড় কৃতিত্ব প্রণালী এড়িয়ে যাওয়া পাইপলাইনগুলির, যা মনে করিয়ে দেয় যে সরবরাহকারীর মতোই পথের বৈচিত্রও সমান জরুরি।
কূটনীতিও গুরুত্বপূর্ণ। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি থেকে জুনের সমঝোতাপত্র ও এই সপ্তাহের তেহরান বৈঠক পর্যন্ত, অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা ইসলামাবাদকে ওয়াশিংটন ও উপসাগরে এমন মর্যাদা দিয়েছে, যা নয়াদিল্লি উপেক্ষা করতে পারে না। আর এক কট্টর নতুন সর্বোচ্চ নেতার অধীনে রেভলিউশনারি গার্ডের দাপটে চলা শাসনব্যবস্থা লড়াই ছাড়া প্রণালীর প্রশ্নে পিছু হটবে না।
ইজ়রায়েল ও আমেরিকায় ভোটের আগামী কয়েকটা দিন দেখাবে অঞ্চলটা ফের যুদ্ধের দিকে গড়াবে কি না। ভারতের স্বার্থ স্পষ্ট: তেলের প্রবাহ চালু রাখতে হবে, আর লক্ষ লক্ষ ভারতীয় কর্মীর ঘর উপসাগরে যেন আর আগুন না জ্বলে।