Raisina Wire

জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা

ক্ষেপণাস্ত্র থেকে তেলের ব্যারেল: হুথি হামলার আঁচ কীভাবে পৌঁছচ্ছে ভারতের অর্থনীতিতে

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ভারত সরাসরি জড়িত না থাকলেও তার অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে নিরাপত্তা সংকট বাড়লে অপরিশোধিত তেল, পণ্য পরিবহণ ও বিমার খরচ বাড়তে পারে।

আরব উপদ্বীপের কোথাও একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হল। ভারতের কোনও শহরে বিস্ফোরণ ঘটল না, কোনও ভারতীয় শোধনাগারে হামলা হল না। তা সত্ত্বেও সেই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রভাব পৌঁছে যেতে পারে ভারতের বাজারে, শিল্পে এবং সাধারণ মানুষের সংসার খরচে।

কারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জগতে যুদ্ধের প্রভাব শুধু যেখানে হামলা হয়, সেখানেই আটকে থাকে না। সমুদ্রপথে ঝুঁকি বাড়লে জাহাজ চলাচলের রুট বদলায়, বিমার প্রিমিয়াম বাড়ে, পণ্য পৌঁছতে বেশি সময় লাগে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে ঝুঁকির অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত হয়।

লোহিত সাগর ও তার আশপাশে হুথি হামলার নতুন করে বাড়তে থাকা আশঙ্কার তাৎপর্য এখানেই। সংঘাতের কেন্দ্র ইয়েমেন, সৌদি আরব এবং লোহিত সাগর অঞ্চল হলেও তার অর্থনৈতিক অভিঘাত পৌঁছতে পারে ভারত পর্যন্ত—অপরিশোধিত তেলের দাম, পণ্য পরিবহণের খরচ, জাহাজের প্রাপ্যতা এবং ডলারের বিনিময়ে তেল কেনার ব্যয়ের মাধ্যমে।

ভারতের ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের বিপুল অংশ আমদানি করতে হয়। শুধু তেলের সরবরাহ বজায় থাকলেই সমস্যার সমাধান হয় না। সেই তেল কোন সমুদ্রপথে আসছে, পরিবহণের খরচ কত, বিমার প্রিমিয়াম কত এবং ডলারের তুলনায় টাকার মূল্য কত—সবই গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ, কোনও তেলক্ষেত্র হারাতে হবে না, কোনও ভারতীয় শোধনাগারে হামলা হতে হবে না। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাই প্রতিটি ব্যারেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।

দূরের যুদ্ধ কীভাবে অর্থনৈতিক ধাক্কা হয়ে ওঠে?

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা দেখিয়েছে, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কীভাবে পরস্পর সংযুক্ত বাজারগুলিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

২৩ অক্টোবর প্রকাশিত The Secretariat-এর বিশ্লেষণে সৌদি আরবের উপর হুথি হামলা এবং ভারতের অর্থনীতিতে তার সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, রয়টার্সের ২২ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৩.১৭ ডলারে পৌঁছেছিল। ৪ মে-র পর এটি ছিল সর্বোচ্চ ক্লোজিং মূল্য। <Cite refs={[“turn928647search0”,“turn928647news16”]}/>

এই ঘটনাগুলি দেখায়, অর্থনীতিতে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কীভাবে কাজ করে। বাজারে ব্যবসায়ীরা সম্ভাব্য ঘাটতির আশঙ্কা করেন। জাহাজের মালিকেরা রুট পরিবর্তনের কথা ভাবেন। বিমা সংস্থাগুলি সম্ভাব্য ক্ষতি ও বিলম্বের ঝুঁকি হিসাব করে প্রিমিয়াম বাড়ায়। ক্রেতারা নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেশি দাম দিতেও প্রস্তুত হন।

এর ফলে বাস্তবে তেলের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই জ্বালানি ও বাণিজ্যের খরচে অতিরিক্ত ঝুঁকিমূল্য যুক্ত হতে পারে।

ভারতের জন্য সমস্যা হল, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম নির্ধারিত হলেও তার প্রভাব পড়ে দেশের ভিতরে। পরিবহণ, উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং পরিবারের ব্যয়ের উপর সেই চাপ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তবে সব ক্ষেত্রেই প্রভাব সমান হবে না। সংকট কত দিন স্থায়ী হয়, বিকল্প সরবরাহ কতটা পাওয়া যায়, টাকার বিনিময়মূল্য কীভাবে বদলায়, সরকার কতটা কর বা মূল্য সমন্বয় করে এবং জ্বালানি সংস্থাগুলি কতটা বাড়তি খরচ গ্রাহকের উপর চাপায়—এসবের উপর নির্ভর করবে চূড়ান্ত অভিঘাত।

তবু ঝুঁকিটি বাস্তব।

বাব-এল-মান্দেব ও হরমুজ: দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রদ্বার

এই পরিস্থিতি বুঝতে দুটি সামুদ্রিক পথের গুরুত্ব আলাদা করে দেখতে হবে।

হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং বৃহত্তর ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলির তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, ইয়েমেন ও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের মাঝখানে অবস্থিত বাব-এল-মান্দেব প্রণালী এডেন উপসাগরকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। এই পথ ধরে জাহাজ সুয়েজ খাল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগর ও ইউরোপে পৌঁছতে পারে।

দুটি প্রণালীর ভৌগোলিক ভূমিকা আলাদা হলেও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে তাদের গুরুত্ব পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। হরমুজ উপসাগরীয় জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ। বাব-এল-মান্দেব এবং লোহিত সাগর এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহণের অন্যতম প্রধান করিডর।

একই সময়ে এই দুই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে প্রভাব শুধু তেলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কনটেনার পরিবহণ, শিল্পের কাঁচামাল, সার, ভোগ্যপণ্য এবং অন্যান্য পণ্যের সরবরাহও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।

লোহিত সাগর এড়িয়ে চলতে হলে জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হতে পারে। এতে যাত্রাপথ দীর্ঘ হয়, জ্বালানি খরচ বাড়ে, পণ্য পৌঁছতে বেশি সময় লাগে এবং জাহাজ দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় বাজারে উপলব্ধ পরিবহণক্ষমতাও কমে যায়।

এখানে মূল বিষয় হল, সমুদ্রপথের উপর প্রভাব ফেলতে আনুষ্ঠানিক অবরোধ সব সময় প্রয়োজন হয় না। নিরাপত্তা ঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী হলে জাহাজ সংস্থাগুলি নিজেরাই বিকল্প রুট বেছে নিতে পারে।

তাই অল্প কয়েকটি জাহাজে হামলা হলেও তার অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারের দাম আর ভারতের কেনা তেলের দাম এক নয়

আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক মূল্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভারতীয় শোধনাগারগুলিকে বাস্তবে কত খরচে তেল কিনতে হচ্ছে, তা বোঝার জন্য শুধু সেই সংখ্যা যথেষ্ট নয়।

তেলের চূড়ান্ত খরচ নির্ভর করে আন্তর্জাতিক দামের পাশাপাশি তেলের ধরন, জাহাজভাড়া, বিমা, চুক্তির শর্ত এবং ভারতে তেল পৌঁছে দেওয়ার অন্যান্য ব্যয়ের উপর। পেট্রোলিয়াম প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যানালিসিস সেলের হিসাব করা ভারতীয় ক্রুড বাস্কেট এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

The Secretariat-এর বিশ্লেষণে অক্টোবর মাসে ভারতীয় ক্রুড বাস্কেটের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০–১২২ ডলারের কাছাকাছি থাকার কথা বলা হয়েছে। জুলাই ও অগস্টের তুলনায় এই দাম বেশি ছিল বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি দৈনিক তথ্য দিয়ে এই সংখ্যাগুলি যাচাই করা দরকার। তবে মূল অর্থনৈতিক বিষয়টি স্পষ্ট—ভারতে পৌঁছনো তেলের দাম আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কের সঙ্গে সব সময় এক গতিতে চলে না। <Cite refs={[“turn928647search0”]}/>

সমুদ্রপথের ঝুঁকি এই ব্যবধান বাড়াতে পারে। যুদ্ধঝুঁকির বিমার খরচ বাড়লে, জাহাজভাড়া বেড়ে গেলে অথবা দীর্ঘ পথ ঘুরে আসতে হলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও এই অতিরিক্ত খরচ তৈরি হতে পারে।

এর বিপরীত পরিস্থিতিও সম্ভব। উত্তেজনা কমলে, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে এবং বিমার খরচ কমলে এই ঝুঁকিমূল্যের কিছু অংশ আবার কমতে পারে।

ভারতের নীতিনির্ধারকদের তাই সাময়িক বাজারের ওঠানামা এবং দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি ব্যয়ের বৃদ্ধির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। সরকারি ব্যয়, জ্বালানির দাম, মুদ্রানীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনার জন্য এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।

তেলের পাশাপাশি টাকার বিনিময়মূল্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার দ্বিতীয় বড় ঝুঁকি হল ডলারের তুলনায় টাকার মূল্য।

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের কেনাবেচা প্রধানত মার্কিন ডলারে হয়। ডলারের তুলনায় টাকার মূল্য কমে গেলে একই দামের তেল কিনতে ভারতীয় আমদানিকারকদের বেশি টাকা খরচ করতে হয়।

অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি টাকা দুর্বল হলে দেশের উপর খরচের চাপ আরও বাড়তে পারে।

এই প্রভাব শুধু পেট্রোল ও ডিজেলে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবহণ, বিমান পরিষেবা, পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক এবং বিভিন্ন শিল্প উৎপাদনে তেল গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল বা জ্বালানি। ফলে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহণের খরচ বাড়লে অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়তে পারে।

শেষ পর্যন্ত কতটা মূল্যবৃদ্ধি হবে, তা নির্ভর করবে বাড়তি খরচের কতটা ক্রেতাদের উপর চাপানো হচ্ছে এবং সংকট কত দিন স্থায়ী হচ্ছে তার উপর। সরকার করের পরিবর্তন, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থার মূল্যনীতি বা আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রভাব কমাতে পারে। কিন্তু এতে মূল অর্থনৈতিক খরচ সব সময় দূর হয় না।

কোম্পানিগুলি বাড়তি খরচ নিজেরা বহন করলে মুনাফা কমতে পারে। ক্রেতাদের উপর চাপালে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। সরকার ভর্তুকি বা অন্য সহায়তা দিলে তার একটি অংশ সরকারি অর্থভাণ্ডারের উপর পড়তে পারে।

অর্থাৎ, পেট্রোল পাম্পে দাম অপরিবর্তিত থাকলেই অর্থনৈতিক ধাক্কা উধাও হয়ে যায় না।

মূল্যবৃদ্ধি ও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কঠিন সমীকরণ

তেলের দামের ধাক্কা মুদ্রানীতিকে জটিল করে তোলে। কারণ, একদিকে মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়তে পারে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিও বাধার মুখে পড়তে পারে।

জ্বালানির খরচ বাড়লে পরিবহণ, উৎপাদন ও পণ্য বণ্টনের ব্যয় বাড়ে। আমদানি করা কাঁচামাল বা বেশি জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলির উৎপাদন খরচও বেড়ে যেতে পারে।

মূল্যবৃদ্ধি বাড়লে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত আসে। সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধির চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং টাকার বিনিময়মূল্যকে সমর্থন করার চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু তাতে ব্যবসা ও পরিবারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়বে।

আবার সুদের হার অপরিবর্তিত রাখলে ঋণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা মিলতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক ধাক্কা টাকার উপর চাপ এবং মূল্যবৃদ্ধি বাড়াতে পারে।

মুদ্রানীতি নতুন করে তেলের সরবরাহ তৈরি করতে পারে না। বিপজ্জনক সমুদ্রপথ খুলে দিতে পারে না। বিমার খরচও সরাসরি কমাতে পারে না। তার ভূমিকা হল, এই ধাক্কার বৃহত্তর প্রভাব—বিশেষত মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশা এবং সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠার ঝুঁকি—সামলানো।

তাই জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অর্থনীতি, বাণিজ্য, পরিকাঠামো, মুদ্রানীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা।

কৌশলগত তেলের ভাণ্ডার: সুরক্ষার সময় কেনা, স্থায়ী সমাধান নয়

কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুতের উদ্দেশ্য হল স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হলে সাময়িক সুরক্ষা দেওয়া। এই ভাণ্ডার নীতিনির্ধারকদের বিকল্প সরবরাহের ব্যবস্থা করতে, অল্প সময়ের ঘাটতি সামলাতে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দেয়।

কিন্তু এই ভাণ্ডার কতটা কার্যকর, তা নির্ভর করে দেশের প্রকৃত চাহিদা ও আমদানির তুলনায় তার পরিমাণ কত, তার উপর। সীমিত সময়ের জন্য পর্যাপ্ত তেল থাকা মানেই দীর্ঘস্থায়ী সংকটে দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব, এমন নয়।

ভারতে কৌশলগত তেল সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সংকটের সময় কতটা কার্যকর মজুত ব্যবহার করা যাবে, তা নির্ভর করে ভূগর্ভস্থ ভাণ্ডারে থাকা তেল, তেল সংস্থাগুলির বাণিজ্যিক মজুত এবং সেই তেল দ্রুত বাজারে পৌঁছে দেওয়ার বাস্তব ক্ষমতার উপর।

চিন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে তুলনা করার সময় সরকারি কৌশলগত মজুত, বাণিজ্যিক মজুত, নিট আমদানি এবং কত দিনের আমদানি মেটানোর ক্ষমতা—এই সব বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। হিসাবের সংজ্ঞা আলাদা হলে তুলনাও বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

তবু নীতিগত অগ্রাধিকার স্পষ্ট। ভারতের এমন জরুরি তেলভাণ্ডার দরকার, যা বাস্তবে কত দিন দেশের চাহিদা মেটাতে পারবে তা নিয়মিত যাচাই করা হবে এবং প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবহার করা যাবে।

কৌশলগত মজুত বিকল্প সরবরাহের বিকল্প নয়। বিকল্প সরবরাহ ও সংকট মোকাবিলার ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য এটি অতিরিক্ত সময় দেয়।

তেলের বাইরেও বাড়ছে বাণিজ্যিক খরচ

লোহিত সাগর ইউরোপ এবং অন্যান্য বাজারের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।

জাহাজের রুট বদলালে রপ্তানিকারকদের পণ্য পৌঁছতে বেশি সময় লাগতে পারে। জাহাজভাড়া বাড়তে পারে। আমদানিকারকদের শিল্পের যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি এবং ভোগ্যপণ্যের খরচও বাড়তে পারে।

ছোট ও মাঝারি ব্যবসার উপর এর প্রভাব বিশেষভাবে বেশি পড়তে পারে। বড় সংস্থার তুলনায় তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা কম এবং হঠাৎ পরিবহণ খরচ বেড়ে গেলে তা সামলানোর আর্থিক সামর্থ্যও সীমিত হতে পারে।

দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এমন পণ্য, নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছনো প্রয়োজন এমন শিল্পের কাঁচামাল এবং নির্দিষ্ট দামে করা বাণিজ্যিক চুক্তি বিলম্বের কারণে সমস্যায় পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য না করলেও কোনও সংস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যদি তার সরবরাহকারী একই সমুদ্রপথ ব্যবহার করে।

ফলে এই সংকট শুধু জ্বালানি ক্ষেত্রের নয়। ভারতের রপ্তানির প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা, আমদানি করা কাঁচামালের খরচ এবং ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকরী মূলধনের উপরও প্রভাব পড়তে পারে।

বিলম্ব যদি নিয়মিত ঘটনা হয়ে ওঠে, তবে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তও প্রভাবিত হতে পারে।

ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তাও বড় প্রশ্ন

সমুদ্রপথের সংকট শুধু পণ্য ও তেলের দামের বিষয় নয়। বিশ্ববাণিজ্য সচল রাখেন যে নাবিকেরা, তাঁদের নিরাপত্তার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে ভারতীয় নাবিকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। কোনও জাহাজ ভারতীয় মালিকানাধীন না হলেও অথবা ভারতের জন্য পণ্য বহন না করলেও, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে হামলা হলে তার ভারতীয় নাবিকেরা বিপদের মুখে পড়তে পারেন।

২০২৪ সালের গোড়ায় ইয়েমেনের কাছে Marlin Luanda তেলবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা এই ঝুঁকিকে সামনে এনেছিল। জাহাজটিতে ভারতীয় নাবিক ছিলেন। বিপদে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে ভারতীয় নৌবাহিনীর ভূমিকা দেখিয়েছে, এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা বাস্তব প্রস্তুতি প্রয়োজন।

ভারত আরব সাগর ও এডেন উপসাগর অঞ্চলে অপারেশন সংকল্প-সহ সামুদ্রিক নিরাপত্তা অভিযান চালিয়েছে। এই ধরনের মোতায়েন জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা, নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা এবং বাণিজ্যিক জাহাজকে আশ্বাস দিতে পারে।

তবে শুধু নৌবাহিনীর এসকর্ট দিয়ে প্রতিটি সমুদ্রপথের ঝুঁকি দূর করা সম্ভব নয়। তার জন্য গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা এবং জাহাজ সংস্থা ও নাবিকদের সঙ্গে স্পষ্ট যোগাযোগও জরুরি।

তাই ভারতীয় নাবিকদের সুরক্ষাকে শুধু তেলের দামের আলোচনার একটি গৌণ বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি ভারতের সামুদ্রিক কৌশলের কেন্দ্রীয় অংশ হওয়া দরকার।

ভারতের সামনে পাঁচটি অগ্রাধিকার

প্রথমত, জ্বালানি মজুত বাড়ানো। কৌশলগত পেট্রোলিয়াম ভাণ্ডারের ব্যবহারযোগ্য ক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত মজুত ছাড়ার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। বাস্তব সংকটে কত দিন দেশের চাহিদা মেটানো যাবে, সেই হিসাবই হওয়া উচিত প্রধান মাপকাঠি।

দ্বিতীয়ত, সরবরাহের উৎস ও পথ বৈচিত্র্যময় করা। একাধিক দেশ থেকে তেল কেনার সুযোগ থাকলে কোনও একটি সরবরাহকারী বা সমুদ্রপথের উপর নির্ভরতা কমতে পারে। তবে তেলের দাম, শোধনাগারের প্রযুক্তিগত উপযোগিতা এবং সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।

তৃতীয়ত, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা জোরদার করা। সামুদ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ, অংশীদার নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় এবং বাণিজ্যিক জাহাজের বিপদে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। লক্ষ্য হবে ঝুঁকি আগে শনাক্ত করা এবং নাবিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

চতুর্থত, বাণিজ্যিক সরবরাহব্যবস্থাকে ধাক্কা সামলানোর উপযোগী করা। আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের বিকল্প রুট, জরুরি পরিকল্পনা এবং জাহাজভাড়া ও বিমার খরচ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ছোট ব্যবসার জন্য সহায়তার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

পঞ্চমত, কূটনৈতিকভাবে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করা। উপসাগরীয় দেশ এবং বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে। ভারতীয় নাগরিকদের সুরক্ষা, বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ সচল রাখা এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বড় শিক্ষা: অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা আলাদা নয়

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখা যায় না।

ভারত কোনও আঞ্চলিক সংঘাতে সরাসরি জড়িত না থেকেও তেলের দাম, জাহাজভাড়া, বিমার প্রিমিয়াম, টাকার বিনিময়মূল্য এবং মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে তার প্রভাব অনুভব করতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির পারস্পরিক সংযোগের যুগে ভৌগোলিক দূরত্ব অর্থনৈতিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না।

তবে তেলের দাম বাড়লেই তার সম্পূর্ণ কারণ হুথি হামলা, এমন ধারণাও ঠিক নয়। বড় তেল উৎপাদকদের সিদ্ধান্ত, আঞ্চলিক সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা, চাহিদার পরিবর্তন, মুদ্রার ওঠানামা এবং আর্থিক বাজারের প্রত্যাশাও দামের উপর প্রভাব ফেলে।

নীতিনির্ধারকদের কাজ হল, কোন পথে এই ধাক্কা ভারতের অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে তা শনাক্ত করা এবং সেই প্রভাব সামলানোর ক্ষমতা বাড়ানো।

একটি যুদ্ধক্ষেত্রে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের অর্থনৈতিক অভিঘাত একটি জাহাজের চুক্তি, বিমার প্রিমিয়াম এবং তেলের আমদানি বিল পেরিয়ে ভারতের কারখানা কিংবা পরিবারের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

ভারতের উত্তর তাই শুধু জ্বালানির পরবর্তী মূল্যবৃদ্ধি সামলানো নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী তেলভাণ্ডার, বৈচিত্র্যময় সরবরাহ, স্থিতিস্থাপক বাণিজ্যিক পরিকাঠামো, সামুদ্রিক সুরক্ষা এবং সংঘাতের ঝুঁকি কমানোর কূটনীতি।

তেলের ব্যারেল হল অর্থনৈতিক পরিণতি। ক্ষেপণাস্ত্র হল তাৎক্ষণিক হুমকি। ভারতের কৌশলগত প্রশ্ন হল—এই দুইয়ের মধ্যে যে দূরত্ব, সেই দূরত্বকে অর্থনৈতিক সুরক্ষার ব্যবস্থায় কতটা রূপান্তরিত করা যায়।