আমেরিকা · মধ্যবর্তী নির্বাচন
৩ নভেম্বর আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচন: কীভাবে হয়, আর ভারত কেন নজর রাখছে
হাউসের ৪৩৫টি আসনের সবক'টি আর সেনেটের এক-তৃতীয়াংশে ভোট। ফল ঠিক করবে শুল্ক, এইচ-ওয়ানবি কড়াকড়ি আর বিদেশনীতিতে ট্রাম্প কতটা এগোতে পারবেন।

মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন (মিডটার্ম)। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দু'বছর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা ঠিক করবে এই ভোট। হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের ৪৩৫টি আসনের সবক'টি এবং ১০০ আসনের সেনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনের পাশাপাশি রাজ্যের গভর্নর ও হাজার হাজার স্থানীয় পদেও ভোট হবে।
নয়াদিল্লির কাছে এই ফলের গুরুত্ব ওয়াশিংটনের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর। বিদেশি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ আর বাজেট অনুমোদনের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। গত এক বছরের শুল্ক, ভিসায় কড়াকড়ি আর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি চুক্তি দেখিয়ে দিয়েছে, আমেরিকার রাজনীতি কতটা সরাসরি ভারতের রফতানিকারী, আইটি সংস্থা আর পড়ুয়াদের গায়ে লাগে।
আমেরিকায় ক্ষমতা কীভাবে ভাগ করা
আমেরিকায় ক্ষমতার কড়া বিভাজন রয়েছে। প্রেসিডেন্ট আলাদা ভাবে নির্বাচিত হন এবং প্রশাসনের প্রধান। বিচারবিভাগ বলতে সুপ্রিম কোর্ট ও ফেডারেল আদালত। আইনসভা হল কংগ্রেস, যার দু'টি কক্ষ।
হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে ৪৩৫ জন সদস্য, তাঁরা দু'বছরের জন্য নির্বাচিত হন। আসন ভাগ হয় জনসংখ্যার হিসেবে, তাই ক্যালিফোর্নিয়া বা টেক্সাস থেকে ওয়াইয়োমিং বা আয়োয়ার তুলনায় অনেক বেশি সদস্য আসেন। সেনেটে ১০০ জন সদস্য: রাজ্য ছোট হোক বা বড়, প্রতিটি থেকে দু'জন, আর প্রত্যেক সেনেটরের মেয়াদ ছ'বছর।
যে কোনও ফেডারেল বিল দুই কক্ষে পাশ হওয়ার পরেই প্রেসিডেন্টের সইয়ে আইন হয়। প্রতিটি কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল তার নেতা বেছে নেয়। স্পিকার, এখন লুইজ়িয়ানার মাইক জনসন, হাউসের কর্মসূচি ঠিক করেন; সেনেটে কাজ চালান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা (মেজরিটি লিডার)।
দুই কক্ষের ক্ষমতাও আলাদা। রাজস্ব তোলার বিল হাউসেই আনতে হয়, এবং ফেডারেল আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের ক্ষমতা কেবল হাউসের। সেনেট প্রেসিডেন্টের নিয়োগে সিলমোহর দেয়, চুক্তি অনুমোদন করে এবং ইমপিচমেন্টের বিচার চালায়। আইনের জন্য দুই কক্ষেরই সম্মতি লাগে, তাই কোনও একটি হাতছাড়া হলেও প্রেসিডেন্টের কর্মসূচি আটকে যেতে পারে।
মিডটার্ম কী
মিডটার্ম হয় প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের ঠিক মাঝখানে, এবং একে সাধারণত সরকারের কাজের উপরে গণভোট হিসেবেই দেখা হয়। আসন জেতা হয় ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতিতে, আর রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা রাজ্যে রাজ্যে প্রাইমারি বা ককাসের মাধ্যমে প্রার্থী বাছেন। ভোটার নথিভুক্তির নিয়ম রাজ্যভেদে আলাদা, আর স্থানীয়, রাজ্য ও ফেডারেল ভোট একসঙ্গে হয় বলে কোনও দু'জন ভোটার হুবহু এক ব্যালট পান না। আমেরিকানরা ডাকযোগে, আগাম গিয়ে বা ভোটের দিন ভোট দিতে পারেন, তাই চূড়ান্ত গণনায় কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।
২০২৬-এর ভোটের ময়দান
১১৯তম কংগ্রেসে ব্যবধান খুবই সামান্য, আর ইতিহাস প্রেসিডেন্টের দলের বিপক্ষে: গত ২৩টি মিডটার্মে সেই দল গড়ে হাউসে ২৭টি ও সেনেটে তিনটি আসন হারিয়েছে।
সেনেটে রিপাবলিকানরা ৫৩-৪৭ ব্যবধানে এগিয়ে, তাই ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে। টেক্সাস, মেন, ওহায়ো ও আলাস্কায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। হাউসে রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠতা নড়বড়ে, আর জেনেরিক ব্যালট সমীক্ষা বলছে, নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার বাস্তব সুযোগ রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের।
ভোটাররা এমন এক প্রশাসনের বিচার করছেন, যা দ্রুত পদক্ষেপ করেছে। ট্রাম্পের ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি (ডজ) প্রায় ২,৬৪,০০০ ফেডারেল চাকরি ছাঁটাই করেছে। সংস্থাগুলির ভাল আয় সত্ত্বেও কোর মূল্যবৃদ্ধি ফের বেড়ে ২.৬ শতাংশে পৌঁছেছে, ফলে জীবনযাত্রার খরচই ভোটারদের সবচেয়ে বড় চিন্তা। ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলার পরে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ হরমুজ় প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করেছে এবং আমেরিকায় পেট্রলের দাম গ্যালন-প্রতি ৪.৫০ ডলারের শীর্ষে তুলেছে। এগ্জ়িকিউটিভ অর্ডারের মাধ্যমে ট্রাম্প আমদানিতে ১০ শতাংশ মূল শুল্ক চাপিয়েছেন এবং চিনা পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে ১২৫ শতাংশ করেছেন। গণহারে বিতাড়নের পরিকল্পনা জরুরি ক্ষমতা সীমিত করা সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আটকেছে, যদিও বৈধ অভিবাসন ও আশ্রয়ে রাশ টানা হয়েছে।
রিপাবলিকানরা জিতলে ট্রাম্প তাঁর কর্মসূচি নিয়ে এগোতে পারবেন। ডেমোক্র্যাটিক হাউস মানে অচলাবস্থা আর কড়া নজরদারি। ডেমোক্র্যাটরা বড় ব্যবধানে জিতলে ইমপিচমেন্টের পথ খুলতে পারে, যদিও প্রেসিডেন্টকে সরাতে সেনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগে।
ভারতের জন্য কী বাজি
ভারতের স্বার্থ তিনটি ক্ষেত্রে: প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা।
- এইচ-ওয়ানবি ভিসা: ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রশাসন নতুন এইচ-ওয়ানবি আবেদনে ১,০০,০০০ ডলার ফি চাপায়। এইচ-ওয়ানবি অনুমোদনের ৭০ শতাংশের বেশি পান ভারতীয়রা, তাই এই পদক্ষেপে ধাক্কা খায় ভারতের ২০,০০০ কোটি ডলারের আইটি পরিষেবা রফতানি শিল্প, আর ভারতীয় পড়ুয়াদের ভর্তি ও কর্মীদের যাতায়াত তীব্র ভাবে কমে।
- শুল্ক: ভারত রাশিয়ার অশোধিত তেল কেনায় ওয়াশিংটন ২০২৫-এ ভারতীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপায়। কঠিন দর-কষাকষির পরে ২০২৬-এর গোড়ায় শর্তসাপেক্ষে তা কমিয়ে অন্তর্বর্তী ১৮ শতাংশ করা হয়, যা ভারতের পাল্টা ছাড়ের সঙ্গে যুক্ত।
- প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা: নতুন ট্রাস্ট (ট্রান্সফর্মিং রিলেশনশিপ ইউটিলাইজ়িং স্ট্র্যাটেজিক টেকনোলজি) উদ্যোগে সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে, যার লক্ষ্য সেমিকন্ডাক্টরে চিনের আধিপত্যের মোকাবিলা।
ডেমোক্র্যাটিক হাউস ট্রাম্পের শুল্ক ও পশ্চিম এশিয়ায় তাঁর সামরিক হস্তক্ষেপের কড়া পর্যালোচনা করতে পারে, যাতে ভারতীয় রফতানিকারীরা কিছুটা কূটনৈতিক ও আর্থিক স্বস্তি পেতে পারেন। তবু নয়াদিল্লির পুরোপুরি উল্টো পথে ফেরার আশা করা উচিত নয়। কোনও দলই সংরক্ষণবাদী নীতি ভেঙে দেওয়ায় তেমন আগ্রহ দেখায়নি, যা আমেরিকার সরবরাহ শৃঙ্খলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দিকে দুই দলেরই ঝোঁকের ইঙ্গিত।