আন্তর্জাতিক কৌশল
রুবিওর ভারত সফরে নতুন বার্তা: কৌশলগত সম্পর্কের চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থই কি এখন বড়?
দিল্লির পরিবর্তে মুম্বই ও জামনগরকে গুরুত্ব দেওয়া মার্কিন বিদেশসচিবের সফরসূচি ভারত–আমেরিকা সম্পর্কের অগ্রাধিকারে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রশ্ন হল, আমেরিকার বাণিজ্যিক স্বার্থকে ভারত কতটা নিজের কৌশলগত সুবিধায় পরিণত করতে পারবে?

কূটনীতিতে কখনও কখনও সরকারি বিবৃতির চেয়ে সফরসূচিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। ২০ ও ২১ অক্টোবর ভারতে এসে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও যে পথ বেছে নিলেন, তা প্রচলিত কূটনৈতিক রীতির থেকে কিছুটা আলাদা। নয়াদিল্লিকে সফরের প্রধান কেন্দ্র না করে তিনি গুরুত্ব দিলেন মুম্বইয়ের কর্পোরেট মহল এবং গুজরাতের জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বিশাল তেল শোধনাগারকে।
এই সিদ্ধান্ত একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে কি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে ওয়াশিংটন? এত দিন যে সম্পর্কের কেন্দ্রে ছিল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, প্রযুক্তি এবং চিনকে ঘিরে অভিন্ন উদ্বেগ, সেখানে কি এখন বাণিজ্য, জ্বালানি কেনাবেচা ও বড় কর্পোরেট সংস্থার স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে?
একটি সফরসূচি দেখেই ভারত–আমেরিকা কৌশলগত অংশীদারিত্বের অবসান ঘোষণা করা যায় না। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসনের সময় রুবিওর সফরের ধরন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিবর্তিত অগ্রাধিকার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।
ভারতের লক্ষ্য আমেরিকার উন্নত প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, বিনিয়োগ এবং বাজারে আরও বেশি সুযোগ তৈরি করা। অন্যদিকে, আমেরিকা চায় ভারতের বিশাল বাজারে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে, ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর করতে এবং ভারতের জ্বালানি আমদানিতে মার্কিন সরবরাহকারীদের অংশ বাড়াতে।
দুই দেশের স্বার্থের মধ্যে মিল রয়েছে। কিন্তু সেই মিল সব ক্ষেত্রে সমান নয়।
দিল্লির বদলে মুম্বই: কূটনীতির কেন্দ্রে কর্পোরেট ভারত
রুবিওর সফরের প্রথম পর্ব ছিল মুম্বইয়ে। সেখানে তিনি ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিদেশমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে ত্রিপাক্ষিক আলোচনাতেও অংশ নেন তিনি। পাশাপাশি টাটা, আদানি ও রিলায়েন্স গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের পর্ব ছিল উল্লেখযোগ্য। সফরের পরবর্তী গন্তব্য ছিল জামনগর।
নয়াদিল্লিকে সফরসূচির বাইরে রাখার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এত উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধির ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক সাধারণত প্রত্যাশিত থাকে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সরকারি কূটনীতি গুরুত্ব হারিয়েছে। জয়শঙ্করের সঙ্গে রুবিওর দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হয়েছে এবং বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কথাবার্তাও চলেছে।
তা হলে পরিবর্তন কোথায়?
পরিবর্তনটি রয়েছে গুরুত্বের বণ্টনে। কূটনৈতিক বৈঠকের পাশাপাশি শিল্পপতিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং একটি বৃহৎ শিল্প পরিকাঠামো পরিদর্শন সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, দুই দেশের সম্পর্ক পরিচালনায় বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর ভূমিকা ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের পরিচিত লেনদেনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এই প্রবণতার মিল রয়েছে। বিনিয়োগ কত হবে, কত পণ্য কেনা হবে, কতটা বাজার খুলবে, কোথায় উৎপাদন হবে এবং কত কর্মসংস্থান তৈরি হবে—এই পরিমাপযোগ্য ফলাফলগুলিই ক্রমশ কূটনৈতিক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন হল, এই পদ্ধতি কি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বকে শক্তিশালী করতে পারে, নাকি জটিল আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে একের পর এক বাণিজ্যিক চুক্তিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলতে পারে?
জামনগর কেন গুরুত্বপূর্ণ: জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন হিসাব
রুবিওর জামনগর সফর ভারত–আমেরিকা সম্পর্কের জ্বালানি মাত্রাটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। রিলায়েন্সের এই শোধনাগার বিশ্বের বৃহত্তম শোধনাগার কমপ্লেক্সগুলির অন্যতম। বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা রয়েছে এর, যার মধ্যে এমন ভারী অপরিশোধিত তেলও রয়েছে যা অনেক সাধারণ শোধনাগারের পক্ষে দক্ষতার সঙ্গে পরিশোধন করা কঠিন।
আমেরিকা চাইছে ভারত তার জ্বালানি সরবরাহের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করুক এবং মার্কিন সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কেনাকাটা বাড়াক। রুবিওর সফরে ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল ভারতীয় শোধনাগারে প্রক্রিয়াকরণের সম্ভাবনাও গুরুত্ব পেয়েছে।
বাণিজ্যিক যুক্তিটি স্পষ্ট। ভারতের হাতে রয়েছে উন্নত শোধনাগার পরিকাঠামো। অন্যদিকে, আমেরিকা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে এবং নতুন ক্রেতা ও বাণিজ্যিক অংশীদার তৈরি করতে আগ্রহী। এই সমীকরণে ভারতীয় শোধনাগার, তেল ব্যবসায়ী এবং জ্বালানি সংস্থাগুলির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু বাণিজ্যিক সুযোগ আর জাতীয় কৌশলগত স্বার্থ এক বিষয় নয়।
ভারত নিজের প্রয়োজনের অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। তাই ভারতের জ্বালানি নীতির মূল লক্ষ্য হল নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং একাধিক উৎস থেকে তেল কেনার স্বাধীনতা বজায় রাখা।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়ার ছাড়যুক্ত অপরিশোধিত তেল ভারতের জ্বালানি ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়। ভারতীয় শোধনাগারগুলির জন্য সেই সরবরাহের বাণিজ্যিক সুবিধাও ছিল।
ওয়াশিংটন বিভিন্ন সময়ে রাশিয়ার তেল কেনার বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার শুধু কূটনৈতিক ইচ্ছায় চলে না। পরিবহণ খরচ, বিমা, নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি, শোধনাগারের প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা এবং সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা—সবই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ভেনেজুয়েলার ভারী তেল প্রক্রিয়াকরণে ভারতের বিশেষায়িত শোধনাগারগুলির সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে দাম, বাণিজ্যিক শর্ত এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার উপর। শুধু আমেরিকা চাইছে বলেই রাশিয়ার তেলের বিকল্প হিসেবে ভেনেজুয়েলার তেলকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
ভারতের সামনে তাই আসল প্রশ্ন আমেরিকা বা ভেনেজুয়েলা থেকে বেশি তেল কেনা উচিত কি না, তা নয়। প্রশ্ন হল, নতুন কোনও ব্যবস্থায় ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে এবং এক দেশের উপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে অন্য কোনও নির্ভরতা তৈরি হবে কি না।
বাণিজ্যচুক্তি: সমঝোতা কতটা কাছে?
ভারত–আমেরিকা সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চাপের জায়গা হল বাণিজ্য।
দুই দেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চালালেও দীর্ঘসূত্রতা এবং মার্কিন শুল্কনীতির কারণে সম্পর্কের পরিবেশ জটিল হয়েছে। আমেরিকা ভারতীয় বাজারে আরও প্রবেশাধিকার এবং মার্কিন সংস্থাগুলির জন্য অনুকূল শর্ত চায়। ভারতকে আবার নিজের উৎপাদক, শিল্পনীতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের স্বার্থও রক্ষা করতে হবে।
সফরের সময় রুবিও বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, চুক্তি সম্পন্ন হতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। কিন্তু এর আগেও একই ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সফরের সময় পর্যন্ত চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়নি।
এই ব্যবধানটি গুরুত্বপূর্ণ। কূটনৈতিক আশ্বাস আর স্বাক্ষরিত চুক্তি এক নয়।
একটি কার্যকর বাণিজ্যচুক্তি ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা কমাতে, বিনিয়োগ বাড়াতে এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সংঘাত প্রশমিত করতে পারে। কিন্তু চুক্তির শর্ত চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাবনাকে সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ভারতের জন্য শুল্কের কাঠামো, বাজারে প্রবেশাধিকার, বিভিন্ন ক্ষেত্রের ছাড়, নিয়ন্ত্রক সুরক্ষা এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতিই হবে আসল বিষয়। শুধু চুক্তি ঘোষণা হলেই যে দুই দেশ সমানভাবে লাভবান হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
ওয়াশিংটনের কাছে চুক্তি হবে চাপ ও আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্যিক ফল পাওয়ার প্রমাণ। নয়াদিল্লির কাছে চ্যালেঞ্জ হল, আমেরিকার রাজনৈতিক অস্বস্তি দূর করার পাশাপাশি ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থও সুরক্ষিত রাখা।
কর্পোরেট শক্তি যখন কৌশলগত সম্পদ
রুবিওর সফরে ভারতের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলির গুরুত্ব আধুনিক ভূরাজনীতির একটি বড় প্রবণতাকে তুলে ধরে। অর্থনৈতিক শক্তি এবং বিদেশনীতি ক্রমশ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
বড় ভারতীয় সংস্থাগুলি এমন বাজার, উৎপাদন ক্ষমতা, জ্বালানি পরিকাঠামো এবং বিনিয়োগের সুযোগ দিতে পারে, যা শুধু সরকারি উদ্যোগে তৈরি করা কঠিন। আমেরিকার কাছে এই সংস্থাগুলির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণের একটি বাস্তবসম্মত উপায়।
রিলায়েন্সের সঙ্গে যুক্ত মার্কিন শোধনাগার বিনিয়োগের পরিকল্পনাও এই বৃহত্তর সম্পর্কের অংশ। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা শিল্প সহযোগিতা বাড়াতে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গভীর করতে পারে।
কিন্তু কোনও সংস্থার বাণিজ্যিক লাভ মানেই দেশের কৌশলগত লাভ নয়।
একটি বেসরকারি সংস্থা সাধারণত বিনিয়োগের সম্ভাব্য মুনাফা, নিয়ন্ত্রক ঝুঁকি এবং ব্যবসার কার্যকারিতা বিচার করে। একটি রাষ্ট্রকে এর পাশাপাশি দেখতে হয় সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক প্রভাব, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার ঝুঁকি।
ভারতের তাই বড় বাণিজ্যিক চুক্তিকে শুধু বিনিয়োগের অঙ্ক বা রপ্তানির সম্ভাবনা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে, সেগুলি দেশের নিজস্ব সক্ষমতা এবং কৌশলগত স্বাধীনতা কতটা বাড়াচ্ছে।
চিনের প্রশ্ন: কোথায় মিল, কোথায় সীমাবদ্ধতা?
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি উদ্যোগ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সমন্বয়ের মাধ্যমে ভারত–আমেরিকা সম্পর্ক গত দুই দশকে বিস্তৃত হয়েছে। চিনের ক্রমবর্ধমান শক্তি নিয়ে দুই দেশের উদ্বেগ এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
কিন্তু ভারত কখনও আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটের অংশ হয়নি। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ভারতের বিদেশনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আমেরিকা যেসব দেশকে প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে, তাদের সঙ্গেও ভারত সম্পর্ক বজায় রাখে।
ট্রাম্প প্রশাসনের লেনদেনকেন্দ্রিক নীতি এই পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করতে পারে। চিনকে মোকাবিলার প্রয়োজন হলে আমেরিকা ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখবে, অথচ বাণিজ্য বা জ্বালানির ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করবে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে নয়াদিল্লি সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
তবে প্রতিটি মার্কিন বাণিজ্যিক প্রস্তাবকে কৌশলগত হুমকি হিসেবেও দেখা উচিত নয়। প্রতিযোগিতামূলক দামে জ্বালানি আমদানি, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ভারতের জন্য বাস্তব সুবিধা তৈরি করতে পারে।
ভারতের কাজ হল, কোন সহযোগিতা দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াচ্ছে আর কোনটি মূলত আমেরিকার স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য পূরণ করছে, তা আলাদা করে দেখা।
এখন ভারতের নজর কোথায় থাকা উচিত?
রুবিওর সফর সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা কি না, তা বোঝার জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, বাণিজ্যচুক্তি। একটি ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে বোঝা যাবে, দুই দেশ শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব সমঝোতাতেও পৌঁছতে পারছে।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি আমদানি। আমেরিকা বা ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনা বাড়লে তা প্রতিযোগিতামূলক দামে হচ্ছে কি না এবং ভারতের সরবরাহ নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে কি না, সেটিই হবে প্রধান পরীক্ষা।
তৃতীয়ত, বৃহত্তর কৌশলগত সহযোগিতা। প্রতিরক্ষা, উন্নত প্রযুক্তি, অসামরিক পরমাণু সহযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সমন্বয় কতটা এগোচ্ছে, তা দেখাবে সম্পর্কের ভিত্তি শুধু বাণিজ্যিক লেনদেনের উপর দাঁড়িয়ে আছে কি না।
পাকিস্তান, চিন এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কও ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক নীতি ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা নয়াদিল্লি পর্যবেক্ষণ করতেই থাকবে।
সন্ধিক্ষণে ভারত–আমেরিকা সম্পর্ক?
রুবিওর সফরকে ভারত–আমেরিকা কৌশলগত অংশীদারিত্বের অবসান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি এমন এক সময়ের প্রতিফলন, যখন এই সম্পর্কের পরিচালনাপদ্ধতি এবং অগ্রাধিকার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অভিন্ন স্বার্থ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, অর্থনৈতিক পরিপূরকতা এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে গভীর যোগাযোগ—এই ভিত্তিগুলি এখনও রয়েছে।
তবু মুম্বইয়ের কর্পোরেট মহল এবং জামনগরের শোধনাগারকে সফরের কেন্দ্রে রাখার সিদ্ধান্ত দেখায়, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালনায় তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্রমশ বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। ভারতের জন্য ঝুঁকি হল, কৌশলগত সহযোগিতার সঙ্গে বাণিজ্যিক ছাড়কে শর্ত হিসেবে জুড়ে দেওয়া হতে পারে, আর আমেরিকার নীতি ঘরোয়া রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে বদলে যেতে পারে।
ভারতের উত্তর হওয়া উচিত হিসেবি কূটনীতি—দৃঢ়ভাবে দরকষাকষি করা, জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যময় রাখা, স্থিতিশীল বাণিজ্যিক নিয়মের দাবি জানানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে লাগানো।
শেষ পর্যন্ত, একটি কৌশলগত অংশীদারিত্বের সাফল্য নির্ধারিত হয় না কতগুলি বৈঠক হল বা কত বড় বিনিয়োগের ঘোষণা এল, তা দিয়ে। আসল পরীক্ষা হল, দুই দেশের তাৎক্ষণিক স্বার্থে অমিল দেখা দিলেও তারা সহযোগিতা বজায় রাখতে পারে কি না।
রুবিওর সফর সেই পরীক্ষাকেই সামনে এনেছে। ভারতের চ্যালেঞ্জ হল, আমেরিকার বাণিজ্যিক আগ্রহকে ভারতের কৌশলগত স্বার্থের কাজে লাগানো—কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ককে নিছক লেনদেনে সীমাবদ্ধ হতে না দেওয়া।